কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী মহিলা কলেজ মাঠ। বিকেল হলেই সেখানে এক অন্যরকম যুদ্ধ শুরু হয়। সমাজ আর লোকলজ্জার বিরুদ্ধে এক টুকরো সবুজ ঘাসে একদল মেয়ের স্বপ্ন বোনার যুদ্ধ।
এই যুদ্ধের নেপথ্যে আছেন দুজন মানুষ—এরশাদুল আর মনসুর। তাঁদের লক্ষ্য একটাই, নাগেশ্বরীর প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু পথটা মোটেও সহজ না। এলাকার রক্ষণশীল মানুষজন অনেকেই বাঁকা চোখে তাকায়। মাঠে মেয়েদের হাফপ্যান্ট পরে দৌড়ানো নিয়ে কত কথা, কত ফিসফাস! অনেক পরিবার তো মেয়েদের বাড়ি থেকেই বের হতে দিতে চায় না। লোকজনের হাজারো কটু কথা আর বাধা উপেক্ষা করে এরশাদুল আর মনসুর বাড়ি বাড়ি গিয়েছেন, মা-বাবাদের বুঝিয়েছেন।
আজ সেই মাঠে ১২-১৩ জনের একটা ছোট কিন্তু অদম্য দল তৈরি হয়েছে।
বিকেলের রোদে যখন ফুটবলটা মাঠে গড়ায়, তখন লাবণী, নুরী, সুমাইয়া, স্মৃতি, তাজিম, সাদিয়া আর আসমানীদের চোখের আগুন দেখার মতো হয়। লাবণীর নিখুঁত পাস, স্মৃতির ডিফেন্স আর সাদিয়া-নূরীরদের গতি দেখে মুগ্ধ না হয়ে উপায় থাকে না। তাজিম, সাদিয়া আর আসমানীসহ দলের প্রতিটি মেয়ে যেন এক একটি জলন্ত স্ফুলিঙ্গ। সবার পায়ে একটাই মন্ত্র—সব বাধা জয় করে গোলপোস্টে বল জড়ানো।

এরশাদুল আর মনসুর মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে ওদের প্র্যাকটিস দেখেন আর বুক ভরে শ্বাস নেন। এখনো অনেক অভাব, বুট জুতোর সংকট, সঠিক ডায়েটের অভাব, তার ওপর সমাজের চোখ রাঙানি তো আছেই। কিন্তু এই দুই জন হাল ছাড়ার পাত্র নন। তাঁরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন প্রতিদিন।
মনসুর যখন বলেন, "পাসটা নিখুঁত কর লাবণী!" আর এরশাদুল যখন স্মৃতিকে ডেকে বলেন, "কড়া ডিফেন্স রাখতে হবে, কেউ যেন ভাঙতে না পারে"—তখন মেয়েদের আত্মবিশ্বাস দ্বিগুণ হয়ে যায়।
তাঁরা দুজনেই জানেন, রাতারাতি ভাগ্য বদলাবে না। কিন্তু তাঁদের মনে গভীর বিশ্বাস—এই পরিশ্রম বৃথা যাবে না। একদিন এই নাগেশ্বরী মহিলা কলেজের মাঠ থেকেই জাতীয় দলে খেলবে এই মেয়েরা। সফলতা আজ না হোক কাল, আস্তে আস্তে আসবেই। সেই আশাতেই বুক বেঁধে প্রতিদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের একঝাঁক স্বপ্নজয়ী মেয়ে।
0 মন্তব্যসমূহ